মুফতি মোহাম্মদ সাদ কাসেমী: আরবি মাসগুলোর নবম মাস হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রোজা হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। রোজা শব্দটি ফারসি। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সওম,
বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সওম অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। পরিভাষায় সওম হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায়
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার থেকে বিরত থাকা।
রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে মোমিনরা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো, পরহেজগার হতে পারো। এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য, গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাতের উপযোগী হওয়া, নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। রমজানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহতায়ালা এ মাসটিকে স্বীয় ওহি সহিফা ও আসমানি কিতাব নাজিল করার জন্য মনোনীত করেছেন। অধিকাংশ কিতাব এ মাসেই নাজিল হয়েছে।
হাদিসে বর্ণিত, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সহিফা রমজানের ১ তারিখে, তাওরাত রমজানের ৬ তারিখে, জাবুর রমজানের ১২ তারিখে, ইঞ্জিল রমজানের ১৮ তারিখে এবং পবিত্র কোরআন কদরের রাত্রিতে নাজিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি এই কোরআনকে কদরের রাত্রিতে নাজিল করেছি। রমজান মাসের রোজা পালনকে ফরজ আখ্যায়িত করে আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারা ১৮৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন, রমজান মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে আর এ কোরআন মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, হক বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে সে এতে রোজা রাখবে, যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তী সময়ে গুনে গুনে সেই পরিমাণ দিন পূরণ করে দেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না, যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহর মহত্ত্ব বর্ণনার পর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।
রোজার প্রতিদান : বোখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসে হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, সিয়াম এবং কোরআন হাশরের ময়দানে বান্দা-বান্দির জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহতায়ালা তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) আরো বর্ণনা করেন রাসুলে পাক (সা.) বর্ণনা করেন, প্রত্যেক বস্তুর জাকাত রয়েছে, তেমনি শরীরেরও জাকাত আছে, আর শরীরের জাকাত হচ্ছে রোজা পালন করা। অর্থাৎ জাকাতদানে যেভাবে মালের পবিত্রতা অর্জন হয়, তেমনি রোজা পালনের মাধ্যমে শরীর পবিত্র হয়, গুনাহমুক্ত হয়।
হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ হতে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজা এ নিয়মের ব্যতিক্রম, কেননা তা বিশেষভাবে আমার জন্য আমি স্বয়ং তার প্রতিদান দেব, বান্দা তার পানাহার ও কামনা-বাসনাকে আমার সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছে।’
রোজা রেখে সর্ব প্রকার গুনাহ বর্জনের অঙ্গীকার করতে হবে : রোজার মাসে শুরুতে আল্লাহতায়ালা জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন, জান্নাতের দরজা খুলে দেন এবং শয়তানকে শিকলবদ্ধ করে রাখেন। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। নেক কাজে অগ্রগামী হতে পারে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কালামের অনেক জায়গায় শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি আরো বলেন, শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। সে চায় মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা, মদণ্ডজুয়ায় নিমগ্ন করা, মিথ্যা বলায় উদ্বুদ্ধ করা, এককথায় খারাপ কাজে জড়িয়ে দেওয়া। তাই হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও তৎসংক্রান্ত কাজ পরিত্যাগ করল না, তার রোজা রাখার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই শয়তানি কার্যক্রম থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।
রোজাদারের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা : হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদাররা প্রবেশ করবে। অন্যরাও এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে চাইবে। কিন্তু রোজাদার ছাড়া অন্য কাউকে এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। (বোখারি ও মুসলিম)।
রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ : হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল পাক (সা.) এরশাদ করেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি তার ইফতারের সময়, অপরটি হলো আল্লাহতায়ালার দিদার বা সাক্ষাতের সময়। হাদিসে আরো উল্লেখ রয়েছে, ইফতারের সময় দোয়া কবুলের সময়। আল্লাহতায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আর এই সময়ের দোয়া হচ্ছে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিরাহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়িন আন তাগফিরা লি জুনুবি।’
লাইলাতুল কদর : লাইলাতুল কদর হচ্ছে একমনে একটি রাত যে রাতে জেগে ইবাদত-বন্দেগি করলে এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম বলে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। এক হাজার মাসের হিসাব করলে কদরের এক রাতের ইবাদত ৮৬ বছর ৪ মাসের সমান। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তার চেয়েও বেশি বা উত্তম বলেছেন। যে ব্যক্তি কদরের রাতে সওয়ারের আশায় ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আমি যদি কদরের রাত্রি পাই, তাহলে আমি কী দোয়া পড়ব? ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ এই দোয়া পড়বে। হাদিসে আছে, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখ) শবেকদর তালাশ করবে।
তারাবি নামাজ : এশার সালাতের (ফরজ ও সুন্নতের) পর বিতরের আগে দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত। সম্ভব হলে খতম তারাবি আদায় করবে।
ইতিকাফ : আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘ওয়া আনতুম আকিফুনা ফিল মাসজিদ’ তোমরা মসজিদে ইতিকাফ করো। ইতিকাফ শব্দের অর্থ নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ হলো, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় শর্ত সাপেক্ষে নিয়তসহকারে পুরুষরা মসজিদে ও নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা। রমজানের শেষ দশক (২০ রমজান থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত) ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। বিনা প্রয়োজনে অর্থাৎ গোসল, খাবার, প্রস্রাব-পায়খানা ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করতে পারবে না। ইতিকাফ অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল নামাজ ইত্যাদিতে মশগুল থাকবে।