25 Nov 2017 - 12:39:08 am

যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়–বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার

Published on মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৬ at ৩:৩৪ অপরাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়--বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারমোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন: বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার বলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মধ্যে যে দেশপ্রেম ছিল আজ যেন তা হারিয়ে গেছে। এখন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় এটা এখন তাকে ভাবিয়ে তুলে।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার একজন রাজনীতিবীদ, সংগঠক, শ্রমিকনেতা ও সমাজ সেবক।

রাজশাহী জেলার একশ এবং দুই মিটার দৌড়ে পর পর ৫ বার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে ভালো ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন। তার খেলা দেখার জন্য জেলায় অনেক দর্শকের সমাগম হতো।

জেলার ডোমার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও ডোমার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তিনি। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিকনমাটি ধনীপাড়া গ্রামের মৃতঃআব্দুল আজিজ সরকারের ৭ সন্তানের মধ্যে ৩য় তিনি। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি নীলফামারী সরকারী কলেজের বিএ ২য় বর্ষের ছাত্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন জাগরন প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে।
রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লআহ, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষনে অনুপ্রানিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করি। পারিবারিক ভাবে সিদ্ধান্ত জানার পর মায়ের হাতে ভাত খেয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেমে পরি। প্রথমে বোড়াগাড়ী হয়ে গোমনাতি তারপর মশিউর রহমান যাদু মিয়ার বাড়ী হয়ে পরদিন ভারতের মিখলিগঞ্জ হয়ে দেওয়ানগঞ্জে যাই। সেখানে আমাদের সাথে ছিলেন, মানিক, মুক্তা, ধীরাজ, মিজান, জুলফিকার আলী আমরা সকলে একসাথে ভারতীয় বিএসএফের সাথে মুজিবক্যাম্পে যাই। সেখানে জি,এল ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহন করি। জিএল ট্রেনিং এর পর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম, পিন্টু, আহিদার সহ আমরা অনেকেই ৬নং সেক্টর কমান্ডার মেজর ছদর উদ্দিন ও ক্যাপ্টেন আবুল বাশারের নেতৃত্বে পঞ্চগড় জেলার ওমরখানা, জগদল, টোকাপাড়া এবং ঠাকুরগায়ের বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধে অংশনেই। একদিন অপারেশন শেষে আমরা পেয়াদাপাড়া ক্যাম্পে এসে বিশ্রাম নেই সেই সময় পাকবাহিনীরা এক মহিলার মাধ্যমে আমাদের খবর পাঠায় যে মিত্র বাহিনী এসেছে আমাদের দেখা করতে বলেছে আমরা তাদের কথা বিশ্বাস করে এগুতে থাকলে খবর পাই তারা মিত্র বাহিনী নয় পাক বাহনী। তখন তাদের সাথে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। সেখানে আমাদের দুইজন সহযোদ্ধা মালেক ও খালেক নিহত হয়। আমরা পাকবাহিনীর সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলে এগুতে থাকি সেই যুদ্ধে পাকবাহিনীর ১০ জন সদস্যকে হত্যা করে আমরা তাদের ব্যবহৃত সেনাবাহিনীর গাড়ী,মর্টারশেল এবং বিপুল পরিমান বোমা দখল করে নেই। তিনি যুদ্ধে সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সহ যারা যুদ্ধে অংশনিয়েছে তাদের কথা স্মরন করে বলেন তারা সকলেই জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান।
মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে আবেগআল্পুত হয়ে পড়েন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। তিনি বলেন যুদ্ধের সময় আমাদের মধ্যে যে দেশপ্রেম ছিল তা আজ বীলিন হতে বসেছে। সেই সময় ছিল না অর্থের লোভ ছিলনা হিংসা আর বিদ্বেষ কিন্ত এখন সব জায়গায় শুন্যতা বিরাজ করছে। তিনি বলেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ডাক দিয়ে ছিলেন,তার ৭ ই মার্চের ভাষনে উদ্বিপ্ত হয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে এদেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে। তিনি আরো বলেন যুদ্ধের সময় মাহবুব আলম ও অহিদার রহমান তাকে অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। আব্দূল জব্বার বলেন,যুদ্ধের প্রথম ওমরখানা অপারেশনে আমি সহ সাতজন মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আক্রমন করি এবং সফল হই। ২য় দিন আমি, মাহবুব আলম, পিন্টু সহ ৭জন মুক্তিযোদ্ধা পুনরায় অপারেশন করি সেখানেও আমরা সফল হই। পাক বাহিনী আমাদের কাছে পরাভুত হয়। ঢোকপাড়া ক্যাম্পে হঠাৎকরে পাক বাহিনীর আক্রমনে আমাদের সহযোদ্ধা গোলাম গাউস নিহত হন। মেজর দর্জির ওমরখানা ব্যাংকার আক্রমনের নির্দেশে যুদ্ধে নিহত হন মতিউর আহত হয় জহুরুল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার বলেন, যুদ্ধের সময় ঈদে মিলাদুন্নবীতে আমরা ক্যাম্পেই পালন করি ঈদে মিলাদুন্নবী। তিনি বলেন যুদ্ধের অবসর সময়ে আমি,মাহবুব আলম,অহিদার, গোলাম গউস,আর পিন্টু চলে যেতাম জহুরী বাজারে। জহুরী-চাউলহাটি-জলপাইগুড়ি পাকা সড়কের ধারে একটা ছোট বাজার। রাস্তার দুধারে কয়েকটা মনিহারী দোকান আর দুটো চায়ের ষ্টল ছিল। সেখানে অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চাইতো আমরা যুদ্ধে জীততে পারবো কিনা। আমরা কোন উত্তর দিতামনা। তিনি আরো বলেন যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনও মনে শিহরন জাগে। তিনি বলেন সকলের মনে দেশপ্রেম থাকা উচিত দেশপ্রেম না থাকলে দেশের জন্য মায়া থাকেনা।

তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা সহ অন্যান্য সুবিধাদি দেওয়ার জন্য।

তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দৃষ্টি আর্কষন করে বলেন, যারা মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা বনে গিয়ে সরকারী সুযোগ সুবিধা গ্রহন করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের এটাই উপযুক্ত সময়। তিনি বলেন মৃত্যু নিশ্চিত জেনে আমরা যুদ্ধে গেছি আর অনেকেই যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা বনে যান।

তিনি আরো বলেন সরকার সারা বাংলাদেশে রাজাকারের তালিকা করার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত ডোমার উপজেলায় এর কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে তিনি জানান। যতদিন বেচেঁ থাকবো ততদিনেই ডোমারের মানুষের জন্য কাজ করে যাব। বর্তমানে তিনি ডোমার উপজেলা জাতীয়পার্টির সাধারন সম্পাদক ও জেলা কমিটির মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক।

Print Friendly, PDF & Email