25 Nov 2017 - 12:36:56 am

তেভাগা আন্দোলন ও ডিমলা : আজ তেভাগা দিবস

Published on মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৩, ২০১৭ at ৮:৫৭ অপরাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

সরদার ফজলুল হক: আজ ৪ জানুয়ারী। এ দিনটিকে প্রথম বারের মত তেভাগা দিবস হিসেবে পালন করা হবে।  বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন, রাজনৈতিক দল, গণ-সংগঠন এমনকি সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলো মিলিতভাবে নানা কর্মসূচী গ্রহন করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কি হয় এটার জন্য আজ দিনভর অপেক্ষা করতে হবে।

তেভাগা আন্দোলন ও ডিমলা : আজ তেভাগা দিবস

ছবি-সংগ্রহ

এদেশের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসের সব থেকে উজ্জ্বলতম অধ্যায় হল তেভাগা আন্দোলন। আজ থেকে ঠিক ৬৫ বছর আগে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার তালপুকুর গ্রামে কৃষকের বাঁচার অধিকার অর্জন করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পুলিসের গুলিতে নিহত হন স্থানীয় কৃষক সমিরুদ্দিন এবং শিবরাম মাঝি—এরাই তেভাগা আন্দোলনের প্রথম দুই শহীদ। পরে এই চিরিরবন্দরেই তেভাগার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিস-জমিদারের মিলিত আক্রমণে শহীদ হন গজেন বর্মণ এবং ঝড়ু বর্মণ। শুধু এরা নন সমগ্র তেভাগা আন্দোলনে ১৯টি জেলার ৮৬ জন শহীদ হয়ে সংগঠিত গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন পর্বের সূচনা করেন। দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন, রাজনৈতিক দল, গণ-সংগঠন এমনকি সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলো মিলিতভাবে এবছর থেকেই ৪ঠা জানুয়ারিকে ঐতিহাসিক তেভাগা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে।

তেভাগা আন্দোলন ও ডিমলা : আজ তেভাগা দিবস

ঘটনার প্রতিবাদে সেদিন হাজার হাজার কৃষক যে ঐতিহাসিক মিছিল করেছিল সে মিছিলের একটি অংকিত প্রতিছবি

ডিমলার তেভাগা আন্দোলন: এদিকে কৃষক বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তেভাগাঁ আন্দোলনে প্রাণ ঝড়েছিলো কৃষকযোদ্ধা তন্নারায়নের। তিনি ছিলেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামের একজন সাহসী ও দৃঢচেতা প্রতিবাদী কৃষকযোদ্ধা।

কমিউনিস্ট পার্টির ডিমলা উপজেলা সভাপতি প্রবীণ শিক্ষক কমঃ আব্দুর রহিম এর মতে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালে পহেলা জানুয়ারি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামের প্রভাবশালী জোতদাররা বন্দুক নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কৃষকযোদ্ধা তন্নারায়নকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

ঘটনার প্রতিবাদে সেদিন হাজার হাজার কৃষক যে ঐতিহাসিক মিছিল করেছিল তা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কৃষক বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তেভাগাঁ আন্দোলনে সে সময় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় গড়ে ওঠা কৃষক নেতাদেরতেভাগা আন্দোলন ও ডিমলা : আজ তেভাগা দিবস মধ্যে অন্যান্যরা ছিলেন জমসেদ আলী চাটী, বাচ্চা মামুদ, দীন দয়াল, কালাচাঁদ বাবু, কার্তিক কবিরাজসহ নাম না জানা আরও অনেকে। এদের কেউ আজ আর বেঁচে নেই। তবে শুধু রয়ছে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক জ্যোতির্ময় অধ্যায়। কৃষিজীবী মানুষের নিজের জমি আর জমির ফসলের ওপর যে অধিকার রয়েছে তার দৃঢতার পিছনেই ছিল কৃষক বিদ্রোহ তেভাগাঁ আন্দোলন।

উল্লেখ যে, ১৯৪০ সালের গোঁড়ার দিকে জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের ৩ ভাগের ২ ভাগ পাবে চাষী, ১ ভাগ পাবে জমির মালিক। এ দাবী থেকে তেভাগাঁ আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। এ আন্দোলনের আগে বর্গা প্রথায় জমির সমস্ত ফসল মালিকের গলায় উঠত এবং উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক বা তার আরও কম বরাদ্দ থাকত ভূমিহীন কৃষক বা ভাগ চাষীর জন্য। যদিও ফসল ফলানোর জন্য বীজ ও শ্রম দু’টোই কৃষক দিত।

পাক-ভারত সৃষ্টির আগে কৃষকদের তেভাগাঁ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলেও ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই ডিমলায় তেভাগা আন্দোলন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে। আন্দোলনের শ্লোগান ছিল; নিজ গোলায় ধান তোলো, অর্ধেক নাই, তেভাগাঁ চাই, ধার করা ধানের সুদ নাই। আন্দোলনের এ মন্ত্রে বেগবান হয়ে নীলফামারীর জেলার ডিমলা উপজেলায় শত শত কৃষক মাঠ থেকে যৌথভাবে ধান কেটে নিজেদের(চাষী) বাড়ীতে তুলতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে জোতদাররা তাদের পেটোয়া গুন্ডা বাহিনী চাষীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। সে সময় কৃষকদের লাঠির আঘাতে গুন্ডা বাহিনী ধরাশায়ী হয়ে পালিয়ে যায়। এ অবস্থা দেখার পর ডিমলার জোতদাররা কৃষকদের বিরুদ্ধে ৫টি বন্দুক আমদানি করেছিল।

১৯৪৬ সালের পহেলা জানুয়ারি জোতদাররা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে সেই বন্দুক দিয়েই গুলি করে হত্যা করেছিলো কৃষক বিদ্রোহের তেভাগাঁ আন্দোলনের সোচ্চার কন্ঠস্বর তন্নারায়নকে।

তেভাগা আন্দোলন ও ডিমলা : আজ তেভাগা দিবসঐতিহাসিক তেভাগাঁ আন্দোলনে শহীদ কমরেড তন্নারায়নের নামে ১৯৯৬ সালের ১ নভেম্বর নীলফামারীর ডিমলা সেদর ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে একটি স্মৃতি ফলক স্থাপন করা হয়। কিন্তু আজকের তেভাগা দিবসেও এ স্মৃতি ফলকটি পড়ে রয়েছে চরম অযত্ন-অবহেলায়। সেদিন এ স্মৃতি ফলকটি উম্মোচন করেন তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী কমরেড ইলামিত্র। সে  সময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান বেসরকারী বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী কমরেড রাশেদ খাঁন মেনন।

এ উপজেলা কমিউনিষ্ট পার্টিসহ বিভিন্ন বাম সংগঠন গুলো দীর্ঘ দিন থেকে ১ জানুয়ারীকে শহীদ তন্নারায়ন দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। তবে বাম সংগঠন গুলো সাংগঠনিক অবস্থা পূর্বের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ায় দিনটি পালনের ক্ষেত্রে তেমন একটা প্রভাব জন-মানুষের মাঝে পড়ে না।

সর্বোপরি ডিমলার তেভাগা আন্দোলন ও কৃষক যোদ্ধা শহীদ তন্নারায়নের লড়াইয়ের জ্যোতির্ময় অধ্যায়কে স্বরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতি ফলকটির উন্নয়নের দাবী তুলেছেন স্থানিয় সচেতন মানুষ।

বিঃ দ্রঃ সংবাদটি কপিরাইট আইন দ্বারা সংরক্ষিত

Print Friendly, PDF & Email