21 Nov 2017 - 02:53:25 am

যেভাবে সাংবাদিকতা পেশায় আগমন ও প্রস্থান : সরদার ফজলুল হক

Published on রবিবার, মে ৭, ২০১৭ at ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

সরদার ফজলুল হক: আশির দশকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের সাতজান গ্রামসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে রক্ত আমাশয় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ প্রায় শতাধিক মানুষ মারা যায়। রোগ নিয়ন্ত্রনে কোন ঔষধেই কাজ হচ্ছিলো না। পর্যায় ক্রমে এ রোগ এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে রাখা হতো বিশেষ স্বাস্থ্য ক্যাম্পে। বলতে গেলে পরিস্থিতি স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে থাকে।যেভাবে সাংবাদিকতা পেশায় আগমন ও প্রস্থান : সরদার ফজলুল হক

এ খবরটি চলে যায় প্রয়াত চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের কাছে। সে সময় দৈনিক সংবাদের ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি হিসেবে মোনাজাত উদ্দিন এবং নীলফামারী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন আমিনুল হক (বর্তমানে পিআইবি’র প্রশিক্ষক  ও সম্পাদক সাপ্তাহিক আলাপন)। এমন খবর পেয়ে মোনাজাত উদ্দিন ভাই ছুটে আসেন ডিমলাতে তাঁর সাথে ছিলেন আমিনুল ভাই। রাত যাপনের জন্য বেছে নেন ডিমলা ডাক বাংলো। কাকডাকা ভোরে দু’জন একটি মটর সাইলে উঠে বেড় হয়ে যেতেন মহামারীর খবর সংগ্রহের জন্য মাঠপর্যায়ে। ছবি ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে ফিরে আসতেন ডাক বাংলোতে। সে সময় ডিমলায় ছিল না টেলিফোন, ফ্যাক্স বা বর্তমানের মত ইন্টারনেটের সুযোগ সুবিধা। মোনাজাত ভাই দ্রুত সময়ে মধ্যে সাদা কাগজে কলম দিয়ে সংবাদ লিখতেন। লেখা শেষ হওয়া মাত্রই তিনি আমিনুল ভাইকে দিয়ে সে নিউজ-এর কপি ও ক্যামরা পাঠায় দিতেন রংপুরে। আমিনুল ভাই শতকষ্টের মধ্য দিয়ে নিউজ ও ছবি পৌঁছে দিতেন সংবাদ অফিসে। পর দিন সংবাদের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হতো ডিমলার খবর। আমার জানামতে সে সময় সংবাদের প্রথম পাতায় বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদ প্রকাশের পরপরই টনক নড়ে এরশাদ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। কালবিলম্ব না করে ততকালিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) এম. শামসুল হকসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দু’টি হেলিকপ্টার যোগে ছুটে আসেন ডিমলায়। হেলিকপ্টার দু’টি ল্যান্ড করে ডিমলা উপজেলা সদরে যেখানে বর্তমান ডিমলা মহিলা মহাবিদ্যালয়াট অবস্থিত। তারা এসে এলাকা পরিদর্শন করে রোগের কারণ ও প্রতিকারে জন্য মাটি, পানি, রোগীর প্রসাব, পায়খানা ও রক্ত সহ বেশ কিছু নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান তারা। পরবর্তীতে তা পরিক্ষা-নিরিক্ষা শেষে “নেভীগ্যামন” নামক এক ধরণের অ্যান্টিবায়টিক আবিস্কার করা হয়। এ ঔষধের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা হয় বলে জানান, ততকালিন ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ দক্ষিনা মোহন রায়।

সে সময় আমি অষ্টোম শ্রেণির ছাত্র। ডিমলা উপজেলা সদরে ডাকবাংলোর পাশেই আমার বাড়ী। জীবনে কোন দিন সাংবাদিক দেখি নি। যে দিন শোনলাম যে ডাকবাংলোতে সাংবাদিক এনেছে, সেদিনই বিকেলে ডাকবাংলোর মাঠে ঘুরাঘুরি করছিলাম সাংবাদিক কেমন তা দেখার জন্য কিন্তু সাংবাদিক খুঁজে পাচ্ছি না। সন্ধ্যার একটু আগে আগে মাথার চুল বড় বড় একজন মানুষ হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে কাছে ডাকলেন। ডেকে আমার নাম পরিচয় জেনে নিয়ে বললেন আমার নাম মোনাজাত উদ্দিন আমি একজন সংবাদ কর্মী। আমি বুঝে উঠতে পারি নি যে, সংবাদ কর্মী আর সাংবাদিক একই ব্যক্তি।  তখন আমি ওনাকে বললাম যে, এখানে নাকি সাংবাদিক এসেছেন উনি কথায়। এ কথা বলতে, তিনি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন যে, সাংবাদিক খুঁজছো কেন? আমি বললাম সাংবাদিক দেখার খুব ইচ্ছে। তখন পর্যন্ত ডাক বাংলোতে তেমন কেও নেই তিনি একাই রয়েছেন। হয়তো একা থাকার কারণেই তিনি কিছুক্ষন আমার সাথে কথা বলে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে নিলেন। পরে বললেন ওনার সাথে আমিনুল হক নামে আর এক জন আছেন যাকে তিনি রংপুরে পাঠিয়েছেন। আসলে সংবাদ কর্মীদেরকেই সাংবাদিক বলা হয়ে থাকে। এ কথা বলে তিনি বললেন, সন্ধ্যা হয়েছে বাড়ীতে গিয়ে পড়া-লেখা করো।

ভাবতে অবাক লাগে মোনাজাত উদ্দিনের মত এত বড় মাপের মানুষ যিনি কিনা চারণ সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন অথচ তিনি সরাসরি মুখে বলেননি যে আমি সাংবাদিক। আর এখন কি হচ্ছে অমুখ বলে সাংবাদিক তমুখ বলে সাংবাদিক। সংবাদ লিখতে পারুক আর না পারুক  সেও বলে সাংবাদিক!  

যা হোক ডাক বাংলো থেকে বাড়ীতে আসলাম। পড়া-শুনা শেষে ঘুমিয়ে পড়ি। কি কারণে যেন পর দিন আর স্কুলে গেলাম না। সে দিন দুপুর হতে না হতেই বাড়ীর সামনে পর পর দু’টি হেলিকপ্টার নেমেছে। তা দেখার জন্য আমি সহ আমার মত আরো অনেকেই ছুটে যাই হেলিকপ্টার দেখার জন্য। ক’দিন পরে স্কুলের স্যারদের কাছে জানতে পারি সাংবাদিক খবর লেখার কারণে ডিমলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তখন ভাবতাব সাংবাদিক লিখলে এত কিছু হয়। অতএব আমিও সাংবাদিক হব কিন্তু সাংবাদিক হতে গেলে কি করতে হবে আর লেখাপাড়াই বা কত লাগবে তা জানতাম না। আশাটি মনের মধ্যেই রেখে দিলাম।

নব্বই দশকের প্রথম দিকে হঠাৎ একদিন এক বিজ্ঞাপন দেখলাম যে, শীর্ঘই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আলাপন নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এ পত্রিকার জন্য বিভিন্ন জেলা/ উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে এইচএসসি পাস। বিজ্ঞাপন দেখার পরে সাদা কাগজে একটি দরখাস্ত লিখে আলাপন অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। এর কিছু দিন পরে আমার নামে একটি চিঠি দিয়ে সৈয়দপুর আলাপন অফিসে ডাকা হয়। অফিসে গিয়ে দেখি সাপ্তাহিক আলাপন কর্তৃপক্ষ  আমার মত অন্যদের জন্য সাংবাদিকতার উপরে এক বিশেষ প্রশিক্ষনে আয়োজন করেছেন। প্রথম দিনই এক দিনের প্রশিক্ষন দিয়ে পত্রিকায় নিউজ পাঠানোর দিক নির্দেশনা মূলক পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এর পর থেকে আমার এলাকায় ঘটে যাওয়া সংবাদ গুলো সাদা কাগজে লিখে খোলা ডাকযোগে অফিসে পাঠাতাম। অফিস আমার নিউজ গুলো ঠিক ঠাক করে পত্রিকায় প্রকাশ করে পত্রিকা ডাকযোগে পাঠায় দিতেন আমার কাছে। পত্রিকার সম্পাদক আমার শ্রদ্ধা ভাজন সাংবাদিক আমিনুল হক হলেন আমার প্রথম সাংবাদিকতার গুরু। সে সময় আলাপনে কাজ করতেন সাংবাদিক নজরুল ইসলাম। নজরুল ভাই আমাকে বলতেন ফজলু তুমি খবর লেখার সময় ২টি কপি করবে। একটি কপি অফিসে পাঠাবে আর এককপি তোমার ফাইলে সংরক্ষন করবে। পত্রিকায় খবর প্রকাশের পরে তোমার হাতে থাকা কপির সাথে প্রকাশিত খবরটি মিলায় দেখবে। তাহলে বুঝতে পারবে খবর লেখার মধ্যে তোমার ভুল-ত্রুটি কি আছে। আমিনুল ভাই বলতেন ফজলু সাংবাদিকতা শিখতে চাইলে সব সময় সিনিয়র সাংবাদিকদেরকে সম্মান করবে এবং সিনিয়রদের সাথে মিলে-মিশে থেকে তারা কোন ঘটনা কি ভাবে লিখছেন তা অনুস্বরণ করার চেষ্টা করবে। কখনোই কোন সিনিয়র সাংবাদিকের সাথে বেয়াদবি করবে না। তিনি আর একটি কথা  প্রায়ই বলতেন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে অবশ্যই সম্মান করে কথা বলবে। পাশাপাশি-হোটেল-রেস্তোরার কর্মী ও সরকারী-বেসরকারী অফিসের পিয়নদের সাখে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তবেই তোমার সন্মান বাড়বে। কোথাও গিয়ে প্রয়োজন ছাড়া সহজে সাংবাদিক পরিচয় দিবে না। তোমার কর্মফল দেখে মানুষ তোমাকে সাংবাদিক হিসেব জানবে। এখানে প্রকাশ না করলেই নয়- দীর্ঘ একটি বছর আলাপনে কাজ করার পরে আমার শ্রদ্ধেয় আমিনুল ভাই একদিন ডেকে নিয়ে গিয়ে আমার হাতে আলাপন পত্রিকার ডিমলা প্রতিনিধির পরিচয়পত্র তুলে দেন।

অপর দিকে নীলফামারী সরকারী কলেজের ছাত্র থাকার সময় পরিচয় হয় নীলফামারী সিনিয়র সাংবাদিক সদ্য প্রয়াত মোশাররফ হোসেন ভাইরের সাথে। ওনার হাত ধরে সাপ্তাহিক আলাপনের পাশাপাশি বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক চাঁদনী বাজার পত্রিকায় লেখা-লেখি শুরু করি। চাঁদনী বাজারে কাজ করার সুবাদে প্রতি মাসে একবার হলেও নীলফামারীতে মোশাররফ ভাইরে অফিসে যেতাম। সেখানেই দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকার বর্তমান ষ্টাফ রিপোর্টার তাহমিন হক ববি, আতিয়ার রহমান বাড্ডা, হাসান রাব্বি প্রধান, মীর মাহমুদুল হক আস্তাক ভাইসহ অন্যান্য সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে আমার পরিচয় হয়। ওনারা সবাই আমাকে খুব স্নেহ ও ভালোবাসেন।  ওনাদেরকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি। শুধু শ্রদ্ধা করি তাই না ওনাদেরকে আমি আমার পরিবারের অভিভাবকও মনে করি। ওনাদের কাছ থেকে সাংবাদিকতার বিষয়ে অনেক কিছুই শিখেছি যা কোন দিন ভুলারমত নয়। ওনাদের বদৌলতে বিশেষ করে আমিনুল ভাইরে আন্তরিকতার কারনে সাংবাদিকতার উপরে এ পর্যন্ত ছোট–বড় বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষনে অংশ নেয়ার সুযোগ আমার হয়েছে।

সঞ্চয়ী অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে খবর পাঠাতে থাকি কিন্তু উপজেলা প্রতিনিধি না নেয়ার কারণে কোন ভালো জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ না পেয়ে অবশেষে দৈনিক সংগ্রামে নিয়োগ নেই। সংগ্রামে কিছু দিন কাজ করি কিন্তু বিশেষ কারণে সংগ্রাম ছেড়ে দিয়ে দৈনিক নয়াদিগন্তে যোগদান করি। সাংবাদিকতা পেশায় দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে গিয়েে আমি বহুবার অপ-রাজনৈকি ব্যক্তি, প্রশাসনসহ হলুদ সাংবাদিক/অপসাংবাদিকদের কবলে পড়ে মামলা ও হামলার শিকার হয়েও এ পেশায় টিকে আছি।

তবে সম্প্রতি বছর গুলোতে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়ার জন্য আমাকে অনেকেই অনেকভাবে বলে আসছিলো।  হয়তো আল্লাহ তাদের মনের আশা পূরণ করতে যাচ্ছে। আমাকে এ পেশা ছেড়ে দেয়ার কথা আর শুনতে হবে না। সাংবাদিকতা পেশায় আর কেও আমাকে দেখবেন না এবং আমি নিজেও আর সাংবাদিক পরিচয় দিব না।  যদিও  এ পেশা ছেড়ে চলে যেতে অনেক কষ্ঠ হচ্ছে তবুও উপায় নেই পারবার পরিজনের দিকে চেয়ে সত্যি সত্যি চলে যেতে হচ্ছে। একটি কথা উল্লেখ না করলে নয় আর তাহলো সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমি ডিমলা মহিলা মহাবিদ্যালয়ে হিসেব রক্ষক পদে চাকুরী ককরে আসছি। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান সরকার। তাই সরকারী চাকুরীর আওতায় থেকে সাংবাদিকতা করার কোন সুযোগ নেই।

পাশাপাশি এও বলতে চাই প্রায় দু’বছর হলো  “তিস্তা নিউজ ২৪ ডটকম” নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু করি। যার প্রকাশ ও সম্পাদক হিসেবে আমিই ছিলাম। সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়ার প্রাককালে নিউজ পোর্টালটির প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছি। তবে আমার অবর্তমানে নিউজ পোর্টালটি আগের চেয়ে আরো ভালো চলবে বলে আমি আশা করছি।

যাওয়ার মহুর্তে একটা বড় দুঃখ নিয়ে সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরে যেতে হচ্ছে। কারনটা এ ভাবে প্রকাশ করতে চাই।  একটি লাল পতাকা উৎখাত করতে যেমন আর একটি লাল পতাকার দরকার। ঠিক তেমনি এক দল প্রকৃত সাংবাদিককে দমিয়ে দেয়ার জন্য আর এক দল নামধারী সাংবাদিকের প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত সাংবাদিকদের রোধ করা না গলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপকর্ম করে রাতের আধারে আঙ্গুল ফুঁলায় কলাগাছ বানানো সম্ভব না। তাই প্রকৃত সাংবাদিকদের যে ভাবে হউক দমন করতেই হবে। এর পরেও আশ রাখতে চাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে ইনশাল্লাহ।

Print Friendly, PDF & Email