25 Nov 2017 - 12:34:16 am

ফিরোজ মোল্লার গল্প “ওটা ফেক আইডি ছিলোনা”

Published on মঙ্গলবার, জুলাই ১১, ২০১৭ at ৫:৪৮ অপরাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

ওটা ফেক আইডি ছিলোনা
ফিরোজ মোল্লা

২০১০ সালের মাঝামাঝিতেই ফারহাম, একটি ফেইসবুক একাউন্ট খুলে নেয় তার এক বন্ধুর কাছ থেকে। যদিও তখন বাংলাদেশের মধ্যে ফেইসবুকের জনপ্রিয়তা আজকের মত এমন ছিলোনা। শহরের কিছু মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তখন কেউ কেউ ফেইসবুক ব্যবহার করত, এছাড়া ফিরোজ মোল্লার গল্প “ওটা ফেক আইডি ছিলোনা”অনেকেই ফেইসবুক কি? বা কোন জগতের হালুয়া বুঝতোনা এবং চিনতোনা। আর বাংলাদেশের হাতেগনা কিছু মেয়ে মানুষ ফেইসবুক ব্যবহার করত, যা সংখ্যালগুর মতই বলা যেত সেই সময়। তবে মেয়ে মানুষ ফেইসবুক ব্যবহার করত ছেলেদের চেয়েও অনেক বেশি কিন্তু তারা বাঙালি মেয়ে ছিলোনা তারা ছিলো ইন্দোনেশীয়, পিলিপাইনি, সুদানীয় এবং সিঙ্গাপুরের নাগরিক। তাইতো ফারহাম কোনো বিদেশি মেয়ের আইডি দেখলেই পাগল হয়ে যেত ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানোর জন্য। এবং সাথে সাথে পাঠিয়ে দিতো রিকুয়েস্ট, সেই বিদেশি মেয়েদেরকে। ওরা মেয়ে নাকি ফর্ন স্টার ছবি দেখে বুঝা যেতনা কারণ ওসব মেয়েদের পোষাক আর বিকিনি পোষাকের মধ্যে তেমন তফাৎ ছিলোনা, তবে সবাই যে বিকিনি পড়ত তাও বলা ঠিক হবেনা। ফারহাম খুব খুশি ফেইসবুক একাউন্ট খোলার পর। সারাক্ষণ ফেইসবুক আর অন্যকোনো চিন্তা নেই। তবে তখনো যে ফেক আইডি ছিলোনা এটা ভুল ধারনা। তখনো প্রচুর হিজড়া মার্কা আইডি ছিলো। তাই যখন ফারামের বন্ধু ফারহামকে ফেইসবুক একাউন্টটি খুলে দেয় ঠিক তখন ফেক আইডির ব্যাপারেও মোটামুটি একটা সাধারণ ধারনা দিয়েদেয় ফারহামকে। তারপর থেকেই বন্ধুর কথা মত ফারহাম সব সময় সাবধান থাকে ফেক আইডির ব্যাপারে। একদিন সকালে ফারহাম ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই ফেইসবুকের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিলো, এবং দেখলো তার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট বক্সে একটি রিকুয়েস্ট জমা হয়ে আছে। ফারহাম রিকুয়েস্ট বক্স খুলে দেখলো একটি আইডি থেকে তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানো হয়েছে, আইডি তখন এই নামে ছিলো "ফুল ও ফল" । ফারহাম এমন একটি নামের আইডি দেখে খুব বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠে।অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফারহাম ফুল ও ফল নামের আইডিটি তার ফ্রেন্ড লিস্টে এড করে নেয়। কিছু দিন যাওয়ার পরে একদিন ফুল ও ফল আইডি থেকে ফারহামের ইনবক্সে একটি বার্তা আসে, বার্তাটিতে লেখা ছিলো বাংলিশ ভাষায়:- Hi, kemon achen bhondhu? ফারহাম বার্তাটি দেখার পর পুনোরায় উত্তর করল:- hi, vhalo achi এই পর্যন্ত লেখার পর সেদিন আর কথা হয়না। আবার কয়েক দিন পর, সেই ফুল ও ফল আইডি থেকে আবার বার্তা আসে, ফারহাম বার্তাটি পড়ার পর আর কোনো উত্তর দেয়না। কারণ ফারহাম তার বন্ধুর শিখানো ফেক আইডির কথা মনে করে এটাকেও ফেক আইডি ভেবে আর সামনে এগোতে চাইলোনা। এর মধ্যে ফারহাম বিদেশি মেয়েদের সাথে জমিয়ে চ্যাটিং করছে, তাই ফুল ও ফল আইডির আর কোনো পাত্তাই রইলো না তার কাছে। কিন্তু এর মধ্যে ফুল ও ফল আইডি থেকে ফারহামের ইনবক্সে অনেকগুলো বার্তা জমা হয়ে গেলো। একদিন ফারহাম সেই বার্তা গুলোতে চোখ বুলিয়ে নিলো, এবং দেখলো অনেক দিনের বার্তা জমা হয়ে আছে। সর্বশেষ বার্তাটি ফারহাম আগে পড়ে নিলো, সেখানে লেখা ছিলো:- hi, bhondhu ami fb te notun tai temon ekta bujhina fb. tomake amar vhalo legechilo tai request pathiye chilam. kintu jantam na tumi eto ohongkari. Sunechi meyera naki cheleder shate ohongkar kore kintu ajj dekhlam tar ulta. ami tomar vhalo bondhu hote cheychilam kintu parlam na. vhalo theko. dekha hobe ekdin tomar shate amar. sei din bujhbe. bay. লেখাটি পড়ার পর ফারহামের হৃদয়ে একটা ভালোবাসার ঝড় বয়ে গেলো। ফারহাম পুনোরায় বার্তায় লেখলো:- I am sorry dear. ami bujhte parini. তারপর সেন্ড করল, কিন্তু....! বার্তাটি সেন্ড হচ্ছেনা কারণ ফুল ও ফল আইডি থেকে ফারহামকে ব্লক করে দেওয়া হয়ছে।
ফারহাম অস্থির হয়ে গেলো। খুব বিচলিত ফারহাম। কিছুক্ষণ পর আবার সেই বার্তাটি একবারের জন্য পড়েনিলো। বার্তাটি পড়ার ফাঁকে ফারহামের মনের অজান্তেই তার দুচোখ থেকে দু ফোটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পরলো। ফারহাম ভাবতে লাগলো ফুল ও ফল নামের আইডিটির কথা, হয়ত ওটা কোনো মেয়ে মানুষের আইডি হবে। ও আমাকে অনেকবার ইনবক্স করেছে কিন্তু আমি উত্তর করিনি বলেই ওআমাকে ব্লক করেছে। আমি একটা বোকা, ওটা ফেক আইডি ছিলোনা। তবে যে বললো ওর সাথে আমার দেখা হবে? কে সে? তবে কি মেয়েটি আমার পরিচিত কেউ হবে? এমন জল্পনাকল্পনায় কেটে গেলো ফারহামের জীবন থেকে সাত বছর।
৭ বছর পর-
২০১৭ সাল একুশে বই মেলা ঢাকার বাংলা একাডেমি। ফারহামের একটি একক কাব্যগ্রন্থ বের হলো মেলায়। শুক্রবার বই মেলায় উপচেপড়া ভিড়। ফারহাম তার বইয়ের স্টলে সময় দিচ্ছে, দূর থেকে আগত ভক্তদের সাথে গল্প আর সেল্পীতে একাকার ফারহাম। হঠাৎ একটি মেয়ে এসে স্টলে ফারহামের লেখা সেই কাব্যগ্রন্থটি চাইলো। ফারহাম তখন স্টলের বাইরে ছিলো। মেয়েটি স্টলে থাকা একটি ছেলেকে বইটির মুল্য পরিশোধ করে বলল:- আচ্ছা, এই বইটি যিনি লিখেছেন তিনি কি মেলায় এসেছেন? স্টলের ছেলেটি ফারহামের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে মেয়েটিকে বলল:- ঐ তো কবি ফারহাম! মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে গেলো ফারহামকে দেখার পর,,,,,,,ফারহামের কাছে যেতেই মেয়েটি বললো:- স্যার, আপনার একটা অটোগ্রাফ হবে? ফারহাম খুব বিনয়ের সাথে বললো:- অবিশ্যই । অটোগ্রাফ পাওয়ার পর মেয়েটি বললো:- স্যার, আপনি কি আমায় চিনেছেন? ফারহাম জবাবে বললো: জ্বি না, যদি পরিচয় দিতেন তবে খুশি হতাম। মেয়েটি অনেক্ষণ চুপচাপ থাকার পর খুব আস্তে করে ফারহামকে বললো:- স্যার, আমি ফুল ও ফল!!! ফারহাম প্রথমে ফুল ও ফল শোনার পর একটু দ্বীধাদন্ধের মধ্যে পড়ে গেলো কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেলো সেই সাত বছর আগের ফেক আইডির কথা। ফারহাম হঠাৎ যেন কিছু একটা পেয়ে গেলো! অনেক আবেগাপ্লুত হয়ে জিগাস করলো:- তুমিই তা হলে ফুল ও ফল নামের সেই আইডির মেয়েটি? নাম কি তোমার? মেয়েটি জবাব দিলো:- জ্বি স্যার, আমিই সেই ফুল ও ফল আইডিটি ব্যবহার করতাম। আমার নাম স্মৃতি।
এই ভাবে চলতে থাকলো কিছুক্ষণ। অনেক কথা হলো ফারহাম ও স্মৃতির। হঠাৎ কথার ফাঁকে ফারহাম স্মৃতিকে বললো:- জানো স্মৃতি, সেই যে তুমি ইনবক্সে সর্বশেষ বার্তাটি দেওয়ার পর আমাকে ব্লক করে দিয়েছো তারপর থেকে প্রায় আমি তোমাকে খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। তবে তুমি আমাকে কিভাবে খুঁজে পেলে, অথবা এই মেলায় এসে আমার প্রকাশিত বই ক্রয় করলে?
স্মৃতি:- স্যার, আপনাকে ব্লক করেছি ঠিক কিন্তু আমি আমার ফুল ও ফল আইডির নাম পাল্টিয়ে নীল পদ্ম রেখেছিলাম। এরপর অনেক গুলো মাস কেটে গেলো। একদিন আমি আমার আরেকজন বন্ধুকে ব্লক করতে গিয়ে দেখি আপনার আইডির উপরে আনব্লক লেখা। আপনার জন্য তখন আমার খুব মায়া হলো, তাই আনব্লক উঠিয়ে পুনোরায় আপনাকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি। আর তখন আপনি আমাকে চিনতে পারেননি, না চিনেই আপনি আমার রিকুয়েস্ট গ্রহণ করেছিলেন। তারপর আমি আপনার সব লেখাগুলো পড়তাম, ছবিতে লাইক, কমেন্টস করতাম। হঠাৎ একদিন দেখলাম আপনার টাইম লাইনে একটা পোষ্ট, সাথে সাথে পড়া শুরু করে দিলাম এবং বুঝলাম আপনার একটা কবিতার বই, মেলায় প্রকাশ হচ্ছে। আমিও ঠিক করলাম মেলায় এসে আপনার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ক্রয় করব,আর সেই সাথে দেখাও করব। এই আর কি! আজ আমার স্বপ্ন পুরণ হলো, আমি খুব খুশি স্যার। স্মৃতির মুখে এসব কথা শোনার পর কবি ফারহামের বুকের ভেতর জমে থাকা সেই সাত বছর আগের ফুল ও ফল আইডির জন্য ভালোবাসা সাগরের জলের মত যেন তার হৃদয়ের তীরে আঁচড়ে পড়ছে। কি থেকে কি বলবে ফারহাম? কবি যেন এখানেই নিরব হওয়ার মত অবস্থা। ফারহাম স্মৃতির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো:- স্মৃতি, তোমার স্বপ্ন তো পুরণ করলে তবে কি আমার স্বপ্নিল আকাশের স্বপ্ন গুলো অপুর্ন থাকবে? স্মৃতি মিষ্টি করে মুচকি হাসি দিয়ে, স্যার আপনার স্বপ্ন অবিশ্য পুরণ হবে বলুন কি স্বপ্ন? ফারহাম লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে এক পর্যায় বলেই দিলো, স্মৃতি আমি তোমাকে ভালোবাসি!ভালোবাসার কথা শোনার পর স্মৃতির মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কিন্তু তারপরও স্মৃতি বললো, স্যার এই কথাটি হয়ত আরো আগে বললে আমি আরো খুশি হতাম কিন্তু....
ফারহাম: আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে স্মৃতি, আমি তখনি বুঝতে পেরেছি। স্মৃতি আমি আর এখন থেকে তোমাকে হারাতে চাইনা। সাত বছর ধরে তোমাকে আমি খুঁজেছি। ফারহামের কথার ফাঁকে স্মৃতি যেন কিছু বলতে চাচ্ছে, বললো স্মৃতি: স্যার, এখন যে আর এসব সম্ভব নয়! ফারহাম: কেন স্মৃতি?
স্মৃতি: স্যার, আমি যে হিন্দু!
ফারহাম: আরে তাতে কি হয়ছে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসায় কোনো জাতপাত আমি বুঝিনা, স্মৃতি।
স্মৃতি: স্যার, আমিও ঠিক তাই বিশ্বাস করি কিন্তু এখন যে আর এসব আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনাকে আমিও ভালোবাসি- আপনি আমার প্রিয় কবি ও প্রিয় বন্ধু। স্মৃতির কথা শেষ হতেনাহতেই এক ভদ্র লোক এসে বললো: স্মৃতি চলো, সন্ধ্যা প্রায় হলো। যাবেনা? ফারহাম কিছু বুঝে না উঠার আগেই স্মৃতি বললো: হ্যাঁ, যাবোতো, ভদ্র লোককে বললো, আর ফারহামের দিকে তাকিয়ে স্মৃতি: স্যার, ও হচ্ছে পলাশ, আমার বর!
ফারহাম এসব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো। স্মৃতি তার বরকে ফারহামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। সবে মাত্র ফারহাম স্মৃতির হাতে নজর দিয়ে দেখলো তার হাতে শাঁখা যদিও কপালে একটি নীল টিপ ছিলো। ফারহাম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্মৃতির দিকে। স্মৃতি ও পলাশ দুজনেই বিদায় নিয়ে চলে গেলো ফারহামের ভালোবাসার অজানা পথে। ফারহাম নিজে নিজেই একটা মুচকি হাসি দিয়ে: আসলে দু:খ করার কিছুই নেই। না পাওয়ার মাঝেও অনেক সুখ। তবে ভুলটা আমারি ছিলো, মনে মনে ভাবলো। স্মৃতি যাওয়ার সময় ফারহামের কানেকানে একটি শান্তনার বাণী রচনা করে দিয়েছে। স্মৃতি ফারহামের কানেকানে বলেছিলো, স্যার, একদম দু:খ করবেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি এখনো, তবে ভুলটা আপনারি ছিলো তাই অপেক্ষাটাও করতে হবে আপনাকে পরের জনম পর্যন্ত। বিশ্বাস করুন আমাকে। আর জেনে রাখুন স্যার-
ওটা ফেক আইডি ছিলোনা!

রচনাকাল
০৭/০৭/১৭
টঙ্গী

Print Friendly, PDF & Email