25 Nov 2017 - 03:19:19 pm

পশ্চিমবঙ্গের লেখিকা মিতা চক্রবর্তী সংবাদ বিশ্লেষন “ভাইবোনের বচসায় আত্মহত্য“

Published on মঙ্গলবার, জুলাই ২৫, ২০১৭ at ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

মিতা চক্রবর্তী: উত্তর ২৪ পরগণা (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত): পশ্চিমবঙ্গ গতকালকেই জল্পাইগুড়ির ধূপগুড়িতে স্কুল পড়ুয়া এক দিদির ভাই-এর কাছ পশ্চিমবঙ্গের লেখিকা মিতা চক্রবর্তী সংবাদ বিশ্লেষন “ভাইবোনের বচসায় আত্মহত্য“থেকে টি ভি-এর রিমোট পায়নি বলে আত্মহতার ঘটনায় চমকে উঠেছিলাম।দিদি টিভি-তে গান শুনতে চেয়েছিল আর ভাই কার্টুন দেখছিল।ভাই-এর কাছে দিদি রিমোটটি চেয়ে এবং তা না পেয়ে রাগে , ক্ষোভে কীটনাশক খেয়ে আত্মহননের মতো এক চরম পথ বেছে নেয়। আর আজই দক্ষিণ-২৪ পরগণার বারুইপুরে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো! আজকের ঘটনায় কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিদি তার থেকে দুই বছরের ছোটো স্কুলের ছাত্র ভাই-এর মধ্যে বচসা বাধে মোবাইলে গান শোনার হেডফোন নিয়ে।ভাই তার হেড ফোনটি নিয়ে গান শুনছিল। দিদি তার কাছে ওই হেডফোনটি চায় কিন্তু ভাই তা দিতে অস্বীকার করে। সেই রাগে অথবা ক্ষোভে দিদি মায়ের শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগায় এবং মারাও যায়।
               পর পর দুই দিনে একই রকম ঘটনার প্রেক্ষিতে জনমানসে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। দুই দিদিই প্রায় একই কারনে কেন আত্মহত্যা করলো? বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারন মানুষজন এই বিষয়ে নানা রকম মত ব্যক্ত করেছেন। মনরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে দুটি ক্ষেত্রেই দুই বোনের মনে নিশ্চই কোনো কারনে ক্ষোভ জমে ছিল।সেটা পড়াশুনো,কিছু না পাওয়ার যন্ত্রনা, কোনো বিশেষ সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা অথবা ভাই-এর প্রতি বাবা মায়ের বেশী নজর থাকার মতো নানা কারন হতে পারে। এই সকল কারনগুলি অনেকদিন ধরেই হয়ত মেয়ে দুটির মনে দানা বেঁধেছিল। সেইখান থেকেই প্রচন্ড রাগ বা ক্ষোভের উৎস এবং তার ফলেই এমন চরম পথ তারা বেছে নিয়েছে। সমাজতাত্বিকেরা আবার অন্য কথা বলছেন। তাদের মতে আজকাল বাবা মায়েরা তাদের ছেলে মেয়েদের কিছু না চাইতেই তাদের পছন্দের জিনিসটি হাতে তুলে দিচ্ছে। কারুর সঙ্গে কোনো কিছু ভাগ বা শেয়ার করার বিষয়টিকে একদম উপেক্ষা করেই তারা এইসব কাজ করছেন।এতে সেই ছেলেমেয়েরা কখনই এটা ভাবার অবকাশ পাচ্ছে না যে তারা একক সত্তা নয়।সমাজে বা পরিবারে সুস্থভাবে বাস করতে গেলে সমবেত হয়ে এগিয়ে চলতে হয়। এই শিক্ষা বাবা মায়েরাই প্রাথমিক ভাবে না দিলে একটা বিচ্ছিন্ন ভাব আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে গড়ে উঠছে।তার থেকেও এমন ঘটনা ঘটতেই পারে।পশ্চিমবঙ্গের লেখিকা মিতা চক্রবর্তী সংবাদ বিশ্লেষন “ভাইবোনের বচসায় আত্মহত্য“
                   নানা সময়ে, নানা কারনে "না" বলতে পারাটাও খুব জরুরী । আজকাল অনু পরিবারগুলিতে সন্তান যা চাইছে তাই-ই পেয়ে যাচ্ছে। এটাও একটি বড়ো অসুখের জায়গা। ছোটোরা তো তাদের যা পছন্দ হবে তা চাইবেই  কিন্তু তা দিতেই হবে তা নয়।তা সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক। "না" বললে সাময়িক কিছু ছোটোখাটো সমস্যা দেখা দিতে পারে কিন্তু তা অতি যত্নে, বিবেচনার সঙ্গে বুঝিয়ে তাদের সন্তানদের সামলানো উচিত। "না" কথাটি শোনার মতো ধৈর্য সন্তানদের মধ্যে খুব ছোটোবেলা থেকেই গড়ে না তুললে, তা পরবর্তীকালে নানান সমস্যার সৃষ্টি করে। ছেলেমেয়েদের সব কিছুই যে পেতে হবে ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়।এটাও একটা খুব বড় শিক্ষা।
                   সন্তানদের সামাজিকীকরণের প্রাথমিক স্তরে বাবা মায়েরদেরও কিছু সংযম,অনুশাসনের প্রয়োজন অনস্বীকার্য । বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সন্তানদের কাছ থেকে আপাত মুক্তি পেতে তাদের অভিভাবকেরা তাদের ছেলেমেয়েরা যা চায় তাই-ই দিয়ে দেয়। এই যেমন সন্ধ্যের সময় একের পর এক সিরিয়াল দেখা,সিনেমা দেখা বা সর্বক্ষণ মোবাইলে চোখ রাখার মতো কাজগুলি বাবা এনং বিশেষকরে মায়েরা করে থাকেন। তখন তাদের ছেলেমেয়েরা যাতে বিরক্ত না করে তার জন্য তারা যা চায় তাই দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতেই চেষ্টা করে থাকে। এটা এক রকম নিন্দার বিষয়। তাদেরও ত্যাগের প্রয়োজন। কারন আজকালকার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা বড্ড বেশী বুদ্ধিমান। তারা তাদের বাবামায়েদের দুর্বলতার জায়গাটিকে ব্যবহার করে নিতে এতোটুকুও দ্বিধা করে না।
                   ধূপগুড়ি বা বারুইপুরের দুই মেয়ের স্বভাবে বা আচার আচরনে নিশ্চই কোনো ছাপ বা প্রকাশ ছিল যা দেখে বোঝার অনেকটাই অবকাশ ছিল যে তাদের মনে কোনো না কোনো কারনে অসন্তোষ ছিল।কারন দুইজনেরই বয়সের সন্ধিকালে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেলো! এই সময়টা বড়ো বেশি স্পর্শকাতর। তাই নানা কারনে মনে জমে থাকা  অব্যক্ত ক্ষোভ, জ্বালা,যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি পেতে একটা তুচ্ছ কারনে তারা আত্মহননের মতো এক চরম পথ বেছে নিয়েছে।এমন মত পোষণ করেছেন মনোরোগ বিশেশজ্ঞদের কেউ কেউ। তাদের মতে আজকাল সব কিছু চট জলদি না হলে চলেনা।ওই চট জলদি না পাওয়ার কারনেই এমন আত্মহনন।
                      ঘটনা যাই-ই হোক, আজ তো আর যারা অকালে চলে গেলো তাদের কাছ থেকে কিছুই জানা যাবে না! তবে এই দুটি ঘটনা থেকেই শিক্ষা নেওয়া দরকার।সেই "শিক্ষা নেওয়ার"প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। এটাকে দীর্ঘ সময়ের এক প্রেক্ষিতে বিচার বিবেচনায় রাখা উচিত। কারন জীবন তো একটা কবিতা।সেই কবিতার নানা ছন্দ,নানা সুর,নানা ওঠানামা।সেসব সুর, তাল ,লয়, বা ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়েই জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সেখেত্রে ওঠার যেমন আনন্দ আছে,নামারো ঠিক তেমনই দুঃখ আছে। এই বোধোটা খুব অল্প বয়স থেকেই সন্তানদের মধ্যে জাগিয়ে রাখা দরকার।না হলে আরো অকাল মৃত্যু আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email