• Home »
  • ওপারবাংলা »
  • মুর্শিদাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
মুর্শিদাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
৫ মার্চ '১৮
0 Shares

মুর্শিদাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

ড. মধু মিত্র, মুর্শিদাবাদ(পশ্চিমবঙ্গ): মুর্শিদাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা : এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ/অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্ররূপে একটা সময় মুর্শিদাবাদ গড়ে উঠেছিল। অষ্টাদশ শতকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পালাবদলের সূতিকাগার হিসেবে এই জনপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। নবাবী পরিমণ্ডলে এখানকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সুস্থিতির দিকটি সেভাবে আলোচিত হয়নি।মুর্শিদাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ যদিও বাংলার দিকে ঔপনিবেশিক শক্তির নজর ফেরানো বোঝায় সে পর্ব বিদেশী শক্তিকে আকৃষ্ট করেছিল এই জনপদের দিকে। লর্ড ক্লাইভের ঐতিহাসিক জবানবন্দী থেকে জানা যায় সেদিনের মুর্শিদাবাদের ঔজ্জ্বল্য লন্ডন শহরকেও ম্লান করে দিয়েছে। অষ্টাদশ শতকে এখানে নবাবদের লালনে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা মুক্ত এক মুক্ত বাতাবরণও গড়ে উঠতে থাকে। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের অংশগ্রহণে এখানে সমন্বয়ী সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত পরিক্রমা নজরে আসে। মুর্শিদাবাদ জেলার স্থাপত্যশৈলী, উৎসব, লোকসংস্কৃতিতে সেই সমন্বয়ের সুর এখনও অমলিন। বস্তুত প্রাক ঔপনিবেশিক শাসনের যুগে এখানে বহুত্ববাদী ভারতীয় সংস্কৃতির অনুশীলন চোখে পড়ে। ঔপনিবেশিক পর্বেও মুর্শিদাবাদ তার গুরুত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। উনিশ শতকের প্রারম্ভে বন্দর নগরী হিসেবে কাশিমবাজার পূর্ব ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ বানিজ্য কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠেছিল। শিক্ষা – সংস্কৃতির দিক থেকেও মুর্শিদাবাদ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল নিজেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার ৪ বছর আগেই ঐতিহ্যবাহী বহরমপুর কলেজের প্রতিষ্ঠা। সেই সময়ের শিক্ষানুরাগী মানুষেরা এখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কাশিমবাজারের মহারাজারা উইল করে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের ব্যবস্থাও করে গিয়েছিলেন। কিন্তু আইনগত জটিলতা ও অন্যান্য কারণে তাদের সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরকরণ ও রাজনৈতিক অন্যান্য কারণে কালক্রমে মুর্শিদাবাদ তার গৌরব হারাতে থাকে। অসীম সম্ভাবনা সত্ত্বেও এই জেলা ক্রমশ ভারতবর্ষের পিছিয়ে পড়া জেলার তকমা পায়। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে শাসকদের অবহেলা আর উপেক্ষা মুর্শিদাবাদকে অমাবস্যার জনপদে পরিণত করে। প্রায় ৮০ লক্ষ জনসংখ্যার জেলা মুর্শিদাবাদ। জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ মানুষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। বৃহৎ শিল্প এখানে প্রায় নেই। কৃষিজমি নির্ভর কর্মসংস্থান এখানে প্রধান। তাছাড়া জীবিকা অর্জনের জন্য কয়েক লক্ষ মানুষ প্রবাসে কর্মরত। বাম জমানায় এখানে উন্নয়নের তৎপরতা চোখে পড়ে নি। ২০১১ সালে পরিবর্তনের সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এখানে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি মাল্টি স্পেশাল হাসপাতাল সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। পর্যটনের দিকেও অনেক নতুন নতুন প্রকল্প চালু হয়েছে। মতিঝিল একসময় অপরাধীদের মুক্তাঞচল ছিল। আজ সেই মতিঝিল পার্ক এ জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্থল।
ভৌগোলিকভাবে মুর্শিদাবাদ জেলা পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্র স্থলে অবস্থিত। উত্তর বঙ্গ এবং দক্ষিণ বঙ্গের যোগাযোগ এই জেলার মাধ্যমেই। আর সীমান্ত বাস্তবতা মাথায় রেখে কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের সীমান্তের জেলা। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এখানকার সুস্থিতি জরুরী। যেহেতু শিক্ষার হার কম তাই অপরাধ প্রবণতার সম্ভাবনা বেশী। বিভিন্ন সমীক্ষা র রিপোর্ট অনুযায়ী এখানে নারী পাচার, বাল্যবিবাহের হার বেশি। সুতরাং এই জেলাতে উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাফল্য এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নানা স্কলারশিপ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মেয়েদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ ব্যাপকভাবে সঞ্চারিত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলে দেয় এ জেলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েরা উল্লেখযোগ্যভাবে কলেজ স্তরে সফল হয়েছে। এমনও বলা যায় গ্রামের কলেজগুলিতে ছাত্রীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের এই কন্যাশ্রীদের জন্য দরকার উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। সেক্ষেত্রে এই জেলাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
মুর্শিদাবাদ জেলার সম্ভাবনা অনেক। গৌরবময় অতীত আর সম্ভাবনাময় বর্তমানের মেলবন্ধনে যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে সেখানে আধুনিক যুগের উপযোগী পাঠ্যক্রম এবং ঐতিহ্য আশ্রয়ী বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটবে এমন প্রত্যাশা করা যেতে পারে।
বস্তুত মুর্শিদাবাদ জেলাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তৎপরতা বর্তমান সরকারের আমলেই শুরু হয়েছে। বিগত বাম আমলে এই ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেওয়া তো দূরের কথা বাধা দানের ইতিহাস আমরা সকলেই জানি। কলকাতা কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার সরকারকে সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছেন জেলা এমনকি ব্লক স্তরে। এই মডেলটি একেবারে অভিনব। সেই কর্ম তৎপরতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন জেলাতে অনেক গুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উচ্চ শিক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের সংকোচনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই ভূমিকা ব্যতিক্রমী।
মুর্শিদাবাদ জেলার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ফারুক আহমেদ। এ বিষয়ে তার নিরলস প্রয়াসের কথা সকলের কাছে উদাহরণযোগ্য। তিনিই প্রথম সদর্থকভাবে এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। মূলত তার উৎসাহে মুর্শিদাবাদের প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে একটি ডিপিআর ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর নিকট জমা পড়ে। এই ডিপিআর বেসরকারি স্তরে নেওয়া প্রথম প্রচেষ্টা। ডিপিআর টি তৈরীতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন অধ্যাপক ড. মধু মিত্র, অধ্যাপক ড. ইন্দ্রদীপ ঘোষ এবং উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ও তরুণ লেখক ফারুক আহমেদ। এই ডিপিআর টি তে বিস্তারিতভাবে মুর্শিদাবাদ বিশ্ব বিদ্যালয়ের জমি, ফ্যাকালটি, পাঠ্যক্রম নির্মাণ ও প্রারম্ভিক পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্থান বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিশা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন ও মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস জুড়ে নিয়ে গবেষণা ও পঠনপাঠনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এখানে। মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি ও পাট-আমকে নিয়ে একটা উৎকর্ষ কেন্দ্র তৈরির সম্ভাবনার কথা এই ডিপিআর এ বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।
মুর্শিদাবাদ জেলার বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে মুর্শিদাবাদ স্টাডিজ, ফার্সি স্টাডিজ এবং এখানকার স্থানীয় ইতিহাস ও সমন্বয়ী সংস্কৃতির চর্চা কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে তার সুষ্ঠু দিশা নির্দেশে এই গবেষণামূলক প্রজেক্টটি এই জেলার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হয়।
বিগত কয়েক বছর ধরে এই জেলার বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকাকে মান্যতা দিয়েও অতএব বলে রাখা ভালো এর আগে কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায়োগিক সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করেনি। মুর্শিদাবাদ জেলার ওয়েবকুপা অবশ্য তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন। মিডিয়া ও রাজনৈতিক স্তরে বিষয়টিকে সর্বপ্রথম সদর্থকভাবে ও সফল পেশাদারি ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক ফারুক আহমেদ। মনে রাখতে হবে তিনি ২৬ নভেম্বর ২০১৫ সালের শহীদ মিনারে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর ডাকে বিশাল সমাবেশে এই বিষয়টিকে জোরালোভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। ওই জনসভায় প্রধান অতিথি ও বক্তা ছিলেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ মুর্শিদাবাদ জেলার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সরকারি ঘোষণা বাস্তব। সরকারী স্তরে জমি খোঁজার কাজ শুরু হয়েছে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তিনিই প্রথম এই জেলাবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি ও আবেগের মর্যাদা দিলেন। আর, সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আড়ালে থেকে যারা অক্লান্তভাবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছেন তাদের কথা জানানোর অভিপ্রায় থেকে এই নিবন্ধটির অবতারণা।

লেখক: ড. মধু মিত্র, অধ্যাপক, বহরমপুর গার্লস কলেজ, মুর্শিদাবাদ।

 

Print Friendly, PDF & Email

About dimlanews

Related Posts

Leave a Reply

*

সম্পাদকের বক্তব্যঃ

তিস্তা নিউজ ২৪ ডটকম ভিজিট করুন এবং বিজ্ঞাপন দিন।