• Home »
  • ওপারবাংলা »
  • মণি মুক্তার সন্ধান করছেন আফরিন কাজী ও তাঁর গানের দল শামিয়ানা
মণি মুক্তার সন্ধান করছেন আফরিন কাজী ও তাঁর গানের দল শামিয়ানা
১৩ মার্চ '১৮
0 Shares

মণি মুক্তার সন্ধান করছেন আফরিন কাজী ও তাঁর গানের দল শামিয়ানা

ফারুক আহমেদ, কলকাতা প্রতিনিধি: দেশ জুড়ে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে হানাহানি আর বিদ্বেষের মেঘ। তার মধ্যেই এক চিলতে আকাশ খোঁজার চেষ্টা করছে গানের দল শামিয়ানা। জল জমি জঙ্গলের নিরন্তর ভাগাভাগির মধ্যে ও বেয়নেট এবং কাঁটাতারের উপর মুক্ত আকাশ আর অখন্ড মানব জমিন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মণি মুক্তার সন্ধান করছেন আফরিন কাজী ও তাঁর গানের দল শামিয়ানা। ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালি থেকে টুসু ভাদু ঝুমুর থেকে লালন কিংবা হাসন, এমন কি রবি ঠাকুর, নজরুল ও আছেন শামিয়ানা সুরের ছায়ায়। শিল্পী আফরিন কাজী ও তাঁর দল শামিয়ানা কি ভাবে দেখছে এই সময়ে লোকগানের পরিসর এবং তার চর্চাকে তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ও তিস্তা নিউজ ২৪ ডটকম-এর কলকাতা প্রতিনিধি ফারুক আহমেদ।মণি মুক্তার সন্ধান করছেন আফরিন কাজী ও তাঁর গানের দল শামিয়ানা

প্র: নানা কারণে বাংলা গানের পরিসর যেখানে ছোট হয়ে আসছে সেখানে লোকগান নিয়ে কতটা আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন?

উ: প্রযুক্তির যুগে গানের ধরণ বদলাচ্ছে, শ্রোতা বদলাচ্ছে কিন্তু সুরের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়নি। বরং বাড়ছে। সমাজে সবসময়ই কিছু না কিছু অস্থিরতা থাকে কখনো তা বাড়ে কখনো তা কমে তবে এই সময় সারা পৃথিবী জুড়ে পরিচিতি সত্ত্বার সংকট তীব্রতর হয়েছে। মানুষের চিরায়ত সংস্কৃতি চর্চার পরম্পরাগুলো নানা কারণে ধাক্কা খেয়েছে। ভাঙা গড়ার একটা নিরন্তর পর্ব ও চলছে তবুও এতো কিছুর মধ্যেও লোকগান আসলে সাংস্কৃতিক বহুত্ত্বের কথা বলে। শিকড়ের সঙ্গে লোকগানের যোগটা রয়ে গিয়েছে। এই সময়ে লোকগান যেমন নতুন চেহারায় হাজির করা হচ্ছে ঠিক তেমনই ঐ কাজ করতে গিয়ে অনেকেই লোকগানের শিকড়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন। লোকায়ত সুরের আবেদন যে এখনো ফুরিয়ে যায় নি বরং পরিসর বড়ো হয়েছে। নাগরিক মানুষরাও লোকগানের সুরে ডুব দিচ্ছেন এটাই আশার দিক।
বাংলা লোকগানের পরিসর খুবই ব্যাপ্ত এবং গভীর। দুই বাংলায় এতো সুর এবং ভাবের বৈচিত্র রয়েছে যে কারো পক্ষেই তার সবটা ছুঁয়ে দেখা সম্ভব নয়। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ভাদু, টুসু , ঝুমুর, ছাদ পেটার গান, ধান ভানার গান  ছাড়াও বিয়ের গান, ব্রত কথা যেমন রয়েছে তেমন   মেয়েদের নিজস্ব উপলব্ধি নিয়ে গান ও রয়েছে। তেমন ই লালন, হাসন, শাহ আব্দুল করিমরাও আছেন তাঁদের বিশেষ দর্শনের গান নিয়ে। আছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুলও। বাউল দর্শনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বহু গানের একাত্মতা রয়েছে নজরুলের গানেও ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ঝুমুরের সুরের প্রভাব রয়েছে। শামিয়ানা এ সব কিছুকেই এক জায়গায় গাঁথার চেষ্টা করে। শামিয়ানার বয়স বেশি নয় কিন্তু লোকগানের এই ব্যাপ্ত পরিসরকে বোঝার ক্ষেত্রে আমরা সংবেদনশীল শিক্ষার্থী হতে চাই। শামিয়ানার অনুষ্ঠানে লোকগান এবং সুরের এই বহুত্ত্বের ধারাই তুলে ধরার চেষ্টা করি।

প্ৰ: লোকগানের প্রতি আপনার আগ্রহ তৈরি হলো কি ভাবে?

উ: আমার ছোটবেলা কেটেছে গ্রামে। বর্ধমানের কুসুম গ্রামে। তখনকার গ্রাম অন্যরকম ছিলো। সেই সময় ফসল কাটার মরসুমে রাঢ় বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে এবং পড়শী রাজ্য থেকে প্রচুর মানুষ আসতেন তাঁদের অনেকের কাছেই আশ্চর্য্য সব গান আর সুরের হদিশ মিলতো। ছোটবেলায় তার সব কিছু বুঝতে না পারলেও সুর টানতো। বাড়িতে মা, এবং মেজচাচুর কাছে গান শুনতে শুনতে একটা কান তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। মা নানারকম  গান গাইতেন। কোনো প্রথাগত তালিম না থাকলেও মায়ের গানের গলা ছিল খুব মিঠে। শেখার শুরু সেখান থেকেই। তখন সন্ধ্যেবেলায় ফসল কেটে ফেরার পর অনেকেই নানা রকম গান গাইতেন।সে সব সুরই মনে গেঁথে গিয়েছিলো। তারপর সুর খুঁজতে গিয়েই গান শেখা। সেই শেখার পর্ব এখনো চলছে।

প্ৰ: গানের দলের নাম শামিয়ানা হলো কেন?

উ: গ্রামের জীবনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে শামিয়ানার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নানা রঙের শামিয়ানা ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে  বহু রং কে একজায়গায় এনে ফেলতে শামিয়ানার জুড়ি নেই। তাই লোকগান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যখন দল তৈরির ভাবনা মাথায় এলো তখন এই শব্দটাই সব থেকে বেশি নাড়া দিয়েছে। অনেক ওঠা পড়ার মধ্য দিয়ে দল তৈরি হয়েছে। এখনো অনেক প্রতিকুলতা পেরোতে হয়।

প্র: শামিয়ানার অনুষ্ঠানের বিশেষত্ত্ব কি?

উ: শামিয়ানা মূলত বাংলা লোকসংগীত নিয়ে কাজ করে। এপার বাংলা ওপার বাংলা বিভিন্ন অঞ্চলের গান ছাড়াও লালন ফকির , হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম সহ অনেকের গান অনুষ্ঠানে থাকে। এ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ , নজরুলের লোক আঙ্গিকের গান আমরা শুনিয়ে থাকি। শামিয়ানার নিজস্ব কিছু গান ও রয়েছে। মূলত দেশজ বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার কেই অগ্রধিকার দেওয়া হয়।

প্ৰ: লোকগানের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বহুত্ত্বের সম্পর্কের বিষয় টি কি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে?

উ: বাংলা লোকগানে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বহূত্ত্ব নয় সহনশীলতার বার্তা ও বিশেষ ভাবে গুরুত্ত্ব পেয়েছে। উত্তর বঙ্গের ভাওয়াইয়া, পুব বঙ্গের ভাটিয়ালি, রাঢ় বঙ্গের টুসু ভাদু ঝুমুর ইত্যাদি সব কিছুই তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। লোকায়ত গান অনায়াসেই কীর্তনের সঙ্গে মুর্শিদি গান আজানের সুর মিলিয়ে দিতে পারে। লালন, হাসন করিম আরো অনেকের  গানে সম্প্রীতির কথা বারে বারে উঠে এসেছে। সব ধরনের সংকীর্ণতা অতিক্রম মানুষ কে ভালবাসার কথাই বলা আছে।

প্ৰ: শামিয়ানা নতুন গান তৈরি করার বিষয়ে কি ভাবছে?

উ: বাংলা লোকগানের ভান্ডার এতটাই ঋদ্ধ যে তার সবটা কারো পক্ষেই পুরোপুরি জেনে ওঠা সম্ভব নয়। তবুও সুর নিয়ে নানান রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। শামিয়ানা ও তার বাইরে নয়। সম্প্রতি নিজেদের লেখা গান “নদীর তলায় চাঁদের বাড়ি ” বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমরা গেয়েছি। গানটি শ্রোতারা পছন্দ করেছেন।
প্র: কুসুমগ্রাম থেকে কলকাতায় শামিয়ানার দল তৈরি যাত্রাপথ কেমন ছিলো?

উ: কোনোকিছুই খুব সহজে হয়ে যায় না। কুসুমগ্রামে যখন লোকগানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তখন দল তৈরি করা কিংবা কলকাতায় গান গাওয়ার কথা ভাবিনি নিছক গান ভালোবেসেই গান শিখতে বসা। ধাপে ধাপে যেমন এগিয়েছি তেমনি বহু মানুষের কাজ কাছ থেকে দেখার ও সুযোগ পেয়েছি সে সব থেকেই একটু একটু করে এগোনোর চেষ্টা করছি। স্বাভাবিক ভাবে গান নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়লেও প্রযুক্তির ব্যবহার গানের বাজারের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। মঞ্চের সামনে বসে শিল্পীদের গান শোনার আগ্রহ কমছে। তবে এখনো গ্রামে গঞ্জে কিছুকিছু জায়গায় সচেতন চর্চা রয়ে গিয়েছে। সেখানে ছোট পরিসরে ও গানের অনুষ্ঠান হয়।

প্ৰ: লোকগান নিয়ে শহরের মানুষের আগ্রহ কি বাড়ছে না প্রান্তিক মানুষের একান্ত সাংস্কৃতিক আলাপের বিষয় হয়েই থেকে গিয়েছে?

উ: শুধু বাংলা নয় পৃথিবীর সব ভাষার ক্ষেত্রে লোকগানের মতো এত বৈচিত্রময় ঋদ্ধ সুরের ভান্ডার আর কোথাও নেই। নতুন সুরের খোঁজে বহু হিন্দি এবং বাংলা ছবির গানে লোকগানের সুরের ব্যবহার হচ্ছে। গত কয়েক বছরে একাধিক বাংলা ছবিতে লোকগান ব্যবহার করা হয়েছে। আগে ও এই ব্যবহার হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঐ প্রয়োগ ইঙ্গিত দেয় লোকগান নিয়ে নাগরিক মানুষের আগ্রহ ও বাড়ছে। বহু শহর এবং শহরতলির অনেকে লোকগান নিয়ে চর্চা করছেন। কলকাতায় সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক জায়গায় লোকগানের উৎসব সংগঠিত হচ্ছে। ঐ উৎসব গুলির মান যথেষ্ট ভালো সেখানে গ্রামগঞ্জের শিল্পীদের মতোই শহর কলকাতার শিল্পীরাও এক মঞ্চে অনুষ্ঠান করেন। যা পারস্পরিক আদানপ্রদানের  ক্ষেত্রগুলোকে বাড়িয়ে তুলেছে। যা সার্বিক ভাবে ভালো লক্ষণ।

প্ৰ: লোকগানের ক্ষেত্রে কাদের থেকে শেখা হয়েছে?

উ: অনেকের থেকেই শিখেছি। অনেক খ্যাতনামা অখ্যাতনামা মানুষদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের প্রত্যেকেই খুব গুণী মানুষ। এখনো অনেকের কাছে যাই। তাঁদের সকলের কাছে আমি ঋণী।

প্র: আপনার দলের সদস্য দের সম্পর্কে কিছু বলুন?

উ: আমাদের দলে ছয়জন সদস্য রয়েছি। আমি ছাড়াও দীপেন্দু, প্রতীতি, শুশ্রুত , জয়ন্ত, দেবদীপ, বিশ্বজিৎ রয়েছেন। মিউজিশিয়ান দের সংখ্যা কখনো কখনো এক বা দুজন বাড়ে। হৈ হৈ করে সকলে রিহার্সাল করি। গান নিয়ে কথা হয় আড্ডা হয়।

 
 
 

 
 
 
 
 

Print Friendly, PDF & Email

About dimlanews

Related Posts

    No posts found.

Leave a Reply

*

সম্পাদকের বক্তব্যঃ

তিস্তা নিউজ ২৪ ডটকম ভিজিট করুন এবং বিজ্ঞাপন দিন।