15 Dec 2017 - 04:29:05 am

মহানগরী চট্টগ্রামের মারাত্মক সংকট

Published on রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬ at ৫:১৫ অপরাহ্ণ
Print Friendly, PDF & Email

– জিয়া হাবীব আহ্‌সান,চট্রগ্রাম:  
মহানগরী চট্টগ্রামের মারাত্মক সংকটমারাত্মক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত মহানগরী চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা চলাচলের বিষয়টি এখন মহামান্য উচ্চ আদালতের তদারকিতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। দীর্ঘদিন যাবৎ বিষয়টি নিয়ে চলমান টানাপোড়েন, তর্ক-বিতর্কের অবসান হতে চলছে। এতে নগরবাসীর ও প্রশাসনের উৎকণ্ঠার শেষ হবে এই প্রত্যাশা করেন সংশ্লিষ্ট চিন্তাশীল নাগরিক সমাজ। পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে একটি রিট মামলার কারণে।
মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন গত ২৯/১১/১৫ ইং তারিখে জনৈক মোহাম্মদ আরেফ, কনভেনর, চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা মালিক মহাজোট (মহাজোট), দেওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম কর্তৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং- ১২১৬৭/১৫ তে জাস্টিস তারিক উল হাকিম ও জাস্টিস মোহাম্মদ ফরিদ আহমেদ শিবলী মাননীয় বিচারপতিদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ সিটি মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কে উক্ত মহাজোট কর্তৃক ১৫/১০/১৫ ইং তারিখের প্রদত্ত দরখাস্ত (সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা চলাচলের অনুমতির আবেদন) নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে রেসপন্ডেন্টসগণকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা চলাচলের প্রতিবন্ধকতা (Disturb) সৃষ্টি না করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহামান্য উচ্চ আদালত রেসপন্ডেন্টসগণ যথাক্রমে ১। সচিব, স্থানীয় সরকার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, ২। মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম, ৩। ডেপুটি কমিশনার চট্টগ্রাম এর প্রতি উক্ত নির্দেশ জারী করেন। আদালত উক্ত আদেশ প্রাপ্তির এক মাসের মধ্যে রিট আবেদনকারীর দরখাস্তখানা নিষ্পত্তির জন সিটি মেয়রকে রুল নিশি জারী করেন। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মহামান্য উচ্চ আদালতের উক্ত আদেশ বহাল থাকবে। মেয়র মহোদয় বরাবরে প্রদত্ত আবেদনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৪০ হাজার ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা (ব্যাটারি চালিত) চলাচলের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।” দরখাস্তে চট্টগ্রামের উঁচু নিচু অসমতল এলাকায় মানুষে মানুষ টানার মতো অমানবিক পেশাকে উৎখাত করে কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রিক্সাচালকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান সহ নানা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে । পরিবেশ দূষণমুক্ত সুন্দর আধুনিক শহর গড়ার লক্ষ্যে তারা এর অনুমতি দানের জন্য আবেদনটি মেয়র বরাবরে উপস্থাপন করেন।
নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যাটারি রিক্সার পক্ষেও কিছু কিছু সমর্থন পাওয়া যায় । চট্টগ্রাম মহানগরী ভৌগলিকভাবে পাহাড়–টিলা পরিপূর্ণ একটি নগরী। ফলে উঁচু নিচু সমতল রাস্তার কারণে বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চালিত রিক্সা চলাচলের পক্ষে অনেকেই যুক্তি স্থাপন করেন। তবে ব্যাটারি চালিত রিক্সার অনিয়ন্ত্রিত গতি কারনে ঘন ঘন দুর্ঘটনা হওয়ায় অনেকেই এর ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার বিষয়টিকে সামনে এনে একে নিষিদ্ধ করার দাবী তোলেন। তবে এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা মালিক মহাজোট (মহাজোট) প্রদত্ত প্রসপেকটাসে ব্যাটারী চালিত রিক্সার দুর্বল ব্রেক পরিবর্তন করে হাইড্রোলিক ব্রেক প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব পেশ করে। যেখানে বলা হয়, “বর্তমান ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সার নতুন সংযোজন হাইড্রোলিক ব্রেক সম্পন্ন মোটর এক্সেল বিশিষ্ট গাড়ী। এই হাইড্রোলিক ব্রেক সম্পন্ন গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করা চালকদের পক্ষে খুবই সহজ। এ কারণে অটো ব্রেক সম্পন্ন ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সাটির গুরুত্ব এবং নিরাপত্তা পূর্বের গাড়ির চেয়ে অনেকাংশে বেশী” এবং এটি বুয়েট হতে পরীক্ষিত। এছাড়াও দুর্ঘটনা রোধে ‘চালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “বিগত ৪ বছর ধরে চট্টগ্রাম মহানগরী তথা সারা বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা চলাচল করে আসছে । কিন্তু এ রিক্সা কোন প্রতিষ্ঠানের নজরদারী না থাকার কারণে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এ পর্যন্ত করা যায়নি, যার ফলে নতুন চালক গাড়ি চালাতে এসে দুর্ঘটনায় সম্মুখীন হয়েছে । দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরী। চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা মালিক মহাজোট (মহাজোট) বিআরটিএ এর মাধ্যমে ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সার চালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং যাবতীয় ব্যয় গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ।”
চট্টগ্রাম মহানগরীতে অবৈধ ব্যাটারী চালিত রিক্সা চার্জার গ্যারেজ গড়ে ওঠেছে প্রায় কয়েক হাজার। এই রিক্সা চার্জ খাতে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করাতে প্রতিদিন ২৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে। যা বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ আছে। তাছাড়া এই কারণে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকার রাজস্ব আয়। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা মালিক মহাজোট (মহাজোট) বিষয়টি নাচক করে রিট আবেদনকারী মোঃ আরেফ বলেন, “ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা একটি আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত যানবাহন, যা বিদ্যুৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত করে চালিত হয়। তাই অন্যান্য শিল্প কারখানার মত ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা শিল্পটি বিদ্যুৎ নির্ভর। এই শিল্পের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি গ্যারেজ বৈধভাবে বাণিজ্যিক মিটার ব্যবহার করে আসছে এবং নিষ্ঠার সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রাপ্য বিল প্রদান করছে। এই শিল্পের অন্তর্ভুক্ত কোন গ্যারেজ মালিক বিদ্যুৎ বিভাগে প্রাপ্য বিল পরিশোধ করেননি বা বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া গ্যারেজ পরিচালনা করছেন এমন নজির নেই। আমরা এই শিল্পের সাথে জড়িত সকলে গর্বের সাথে বলতে পারি আমরা অন্যান্য শিল্পের চেয়ে অধিক বিদ্যুৎ বিল (ইউনিট প্রতি ১৩ টাকা) পরিশোধ করে বাংলাদেশ সরকারকে বিদ্যুৎ বিভাগে ভূর্তুকি দেওয়া থেকে রক্ষা করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছি । বিদ্যুৎ বিভাগসহ রাষ্ট্রের আর্থ্য সামাজিক উন্নয়নের যথেষ্ট ভূমিকা রাখার জন্য আমরা এই শিল্প সাথে অন্তর্ভুক্ত সকলেই বদ্ধ পরিকর।” ভুক্তভোগী নাগরিকদের অনেকের বক্তব্য হচ্ছে ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা না থাকলে সিএনজি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায় । এজন্য ব্যাটারি রিক্সা উভয়ের ভাড়ার ভারসাম্য রক্ষা করে।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে রিক্সা লাইসেন্স দেয়ার একমাত্র বৈধ প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’। মূলত ‘দি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন রুলস’ ১৯৮৬ এর ৫৭ ধারা মোতাবেক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন রিক্সাকে লাইসেন্স দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে । তবে উক্ত আইনে বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চালিত রিক্সার উল্লেখ না থাকায় ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সার লাইসেন্স দিতে পারে না এবং ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সা ১৯৮৮ সালের মোটরযান আইন অনুয়ায়ী মোটরযানের মধ্যে পড়ে না । ফলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিসি) ব্যাটারি চালিত রিক্সাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে পারছে না। এছাড়াও কোন রাষ্ট্রীয় নীতিমালাও নেই। তবে এই ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাটারী চালিত প্যাডেল রিক্সা মালিক মহাজোট  পৌরসভা থাকাকালীন অবস্থায় ১৯১৯ সনের ৩২ ধারায় প্রকাশিত বঙ্গীয় আইনের ঐতিহ্য গত যাত্রী পরিবহন ঘোড়ার গাড়ি পরিবর্তন পূর্বক দি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (ট্যাক্সাশন) রুলস ১৯৮৬ এর ৫৭ ধারা মোতাবেক ভ্যান রিক্সা রাস্তায় চলাচলের জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়, যা বর্তমানেও একই ধারায় পায়ে চালিত প্যাডেল রিক্সা-ভ্যান রাস্তায় চলমান রয়েছে। পায়ে চালিত প্যাডেল রিক্সা যেমন দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী যাত্রী পরিবহণ তেমনি ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সাও দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যাত্রী পরিবহণ। এই ক্ষেত্রে প্যাডেল রিক্সা শুধুমাত্র যুগের সাথে পরিবর্তনে আধুনিক যন্ত্র সংযুক্ত করে ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সায় রূপান্তর করা হয় । ”
বর্তমানে ব্যাটারি চালিত প্যাডেল রিক্সাকে যদি চট্টগ্রাম মহানগরীতে নামানো একান্ত আবশ্যক হয় তবে সে ক্ষেত্রে সুবিধার্থে অভিমত হল:
১। মহানগরীতে কি পরিমাণ ব্যাটারি চালিত রিক্সা চলাচল করবে তা নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে হবে। অনির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যাটারি রিক্সা পঙ্গপালের মতো নামতে থাকলে চট্টগ্রাম মহানগরীর সমস্থ রাস্তা অলিগলি তাদের দখলে চলে যাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে ৩৫ হাজার লাইসেন্সধারী রিক্সার স্থলে লক্ষাধিক রিক্সা শহরে চলাচল করে। এ অনিয়মকে নিয়ম শৃংখলা কিছুটা ফিরে আসবে।
২। শুধুমাত্র পাহাড়ী ও টিলা এলাকায় এর চলাচল অধিক্ষেত্র নির্ধারিত থাকবে।
৩। বুয়েটের এক্সপার্ট টিম কর্তৃক নকশা অনুমোদন সাপেক্ষে রিক্সাগুলো নিরাপদ মর্মে সার্টিফাই করতে হবে।
৪। কার্ডধারী চালকদের নির্দিষ্ট পোশাক, অনুমোদন পত্র ইত্যাদি থাকতে হবে।                  ৫। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণের বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
৬। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে পৃথক পাওয়ার স্টেশন সহ বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৭। চুরি, ছিনতাই বন্ধে চালকদের সমিতি কর্তৃক নিশ্চয়তা ও যাত্রী নিরাপত্তার বিধান করতে হবে।
৮। প্রতিটি রিক্সার নাম্বার প্লেট স্পষ্ট থাকবে এবং তার মালিকের ও চালকের নাম ও মোবাইল নাম্বার থাকতে হবে ।
৯। ব্যাটারি চালিত রিক্সাকে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে এবং প্রকৃত বৈধ চালকদের নিয়ে অবৈধ রিক্সা উচ্ছেদ করতে হবে।
১০। কেউ দুর্ঘটনা কবলিত হলে ক্ষতিগ্রস্থকে মালিক চালক সমিতির পক্ষ থেকে উপযুক্ত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে ।
আশা রাখি গত ১৫/১০/১৬ ইং তারিখে মেয়র মহোদয় বরাবরে প্রদত্ত দরখাস্তটি দ্রুত নিস্পত্তি হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যাটারি চালিত রিক্সা কিন্তু শুধুমাত্র চট্টগ্রাম মহানগর পাহাড়ি এলাকায় চলাচল জনবান্ধব হতে হবে। এটাই সংশ্লিষ্টদের ধারণা ।
লেখকঃ আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও কলামিষ্ট।
bhrfctg@gamil.com

Print Friendly, PDF & Email